শিরোনাম

সিগন্যাল

সিগন্যালের ভিন্নতায় বিভ্রান্ত চালক, বাড়ছে ট্রেন দুর্ঘটনা

জেসমিন মলি ও শামীম রাহমান : ঝিনাইদহের সাফদারপুরে গত বছরের ২৭ অক্টোবর দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ট্রেন দুটির একটি ছিল মালবাহী, অন্যটি জ্বালানি তেলবাহী। এ ঘটনায় নষ্ট হয় ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল। দুটি ট্রেনই বাতিল হয়ে যায়। ট্রেন দুটির ইঞ্জিন ও দুর্ঘটনাস্থলের রেললাইন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে সিগন্যাল অমান্য করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে, যার দায় দেয়া হয় রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগকে। এর আগে ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মৃত্যু হয় ১৭ যাত্রীর। এখানেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের সিগন্যাল অমান্য করার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। সিগন্যাল অমান্য কিংবা সিগন্যালের ভুলের কারণে কিছুদিন পর পরই দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে যেমন হতাহতের ঘটনা ঘটছে তেমনি রেলওয়ের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য সিগন্যাল ব্যবস্থার ভিন্নতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল। সম্প্রতি ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল থেকেও দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করে আরেকটি প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্টেশনের সিগন্যালে সিবিআই কালার লাইট, নন-ইন্টারলকড কালার লাইট, সিমাফোর আপার কোয়াড্রেন্ট, সিমাফোর লোয়ার কোয়াড্রেন্ট, কেরোসিন বাতি, সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক বাতিসহ নানা ধরনের সিগন্যালিং সিস্টেম ও সিগন্যাল বাতির রাত্রিকালীন উজ্জ্বলতার তারতম্যের কারণে ট্রেনের চালকরা (লোকোমাস্টার) বিভ্রান্ত হচ্ছেন। সিগন্যালের ভিন্নতাকে রেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। পাশাপাশি  বলা হয়েছে, ক্রু-স্বল্পতার কারণে রানিং স্টাফদের যথাযথ বিশ্রাম না হওয়া, অপারেটিং স্টাফদের ওভার ডিউটির কারণে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা, প্রকৌশল বিভাগের কর্মীদের বিধি অমান্য করে সংশ্লিষ্টদের না জানিয়ে লাইনে কাজ করা, ম্যাটেরিয়াল ট্রলি, পুশ ট্রলি রেললাইনে স্থাপন ও কাজ সম্পন্ন না করে বিপরীতে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে সব মিলিয়ে স্টেশন আছে ৪৮৩টি। এর মধ্যে সিগন্যাল ব্যবস্থাসংবলিত স্টেশনের সংখ্যা ৩৫৩। এ ৩৫৩টি স্টেশনে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে পাঁচ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা। এর মধ্যে সর্বাধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থাটি হচ্ছে রিলে ইন্টারলকিং সিগন্যালিং। ব্যবস্থাটি পুরোপুরি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। সাধারণত যেসব স্টেশনে ট্রেন চলাচল বেশি, সেসব স্টেশনে এ সিগন্যাল ব্যবস্থা রাখা হয়। রেলওয়েতে এ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থাসম্পন্ন স্টেশনের সংখ্যা ২২, যার ২০টিই রয়েছে পূর্বাঞ্চলে। অন্যদিকে কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং সিস্টেম (সিবিআই) ব্যবস্থা আছে ১১২টি স্টেশনে। রেলওয়ে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, এ দুটি সিগন্যাল ব্যবস্থাকে আধুনিক বলা যায়। বাকি ২১৯টি স্টেশনের সিগন্যাল ব্যবস্থা বেশ পুরনো। এ পুরনো পদ্ধতিগুলোর একটি হলো মেকানিক্যাল ইন্টারলকড সিগন্যাল ব্যবস্থা। লাইনের পাশে এক ধরনের তার ব্যবহার করা হয় এ ধরনের সিগন্যালের জন্য, যা সংযুক্ত থাকে স্টেশন এলাকায় স্থাপিত লিভারের সঙ্গে। এ লিভারে টান দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭২টি স্টেশনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। লাল-সবুজ বাতি ব্যবহার করে ট্রেনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয় দেশের ১২২টি স্টেশনে। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় নন-ইন্টারলকড কালার লাইট সিগন্যালিং। ২৫টি স্টেশনে আবার এ ব্যবস্থাও নেই। এসব স্টেশনে ট্রেন প্রবেশের আগ মুহূর্তে স্টেশনমাস্টার ঠিক করেন, কোন লাইন দিয়ে ট্রেনটি যাবে। সে অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ট্রেন যাওয়ার লাইনটি ঠিক করে দেন। এ পদ্ধতিকে বলা হয় নন-ইন্টারলকড মেকানিক্যাল সিগন্যালিং সিস্টেম। বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০১৯ সালের ইনফরমেশন বুকের হিসাব অনুযায়ী, এখনো ১৩০টি স্টেশন সিগন্যালিং সুবিধার বাইরে রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী বেনু রঞ্জন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ের আইন অনুযায়ী ‘ডি’ ক্যাটাগরির স্টেশনে সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। সিগন্যাল সিস্টেম না থাকা স্টেশনগুলো এই ক্যাটাগরিতেই পড়েছে। রেলওয়ের হিসাব বলছে, ৪৮৩টি স্টেশনের মধ্যে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আছে মাত্র ১৩৪টিতে। বাকিগুলোয় ভিন্ন ভিন্ন পুরনো ব্যবস্থায় ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। রেলওয়েতে সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে ট্রেনের সিগন্যাল ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তি এসে জটিল এ কাজ সহজ করে দিয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সেসব দেশে ট্রেন পরিচালনাকেও সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। এখানে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই নামানো হয় একের পর এক ট্রেন। কিন্তু এ ট্রেনগুলো সুশৃঙ্খল ও ঝুঁকিমুক্তভাবে চলাচলের জন্য যে সিগন্যাল ব্যবস্থা দরকার, সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। এখানে উন্নয়নটা হচ্ছে বড় বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক। যেসব উন্নয়নে ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে সেসব উন্নয়নকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করে একের পর এক ট্রেন নামাচ্ছি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে একের পর এক দুর্ঘটনার মাধ্যমে।’ তবে রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ১৩৪টি স্টেশনকে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার আওতায় এনেছি। পর্যায়ক্রমে দেশের সব স্টেশনেই আধুনিক ও অভিন্ন সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। যেসব নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোকে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে।’ তবে কাজটির পরিধি অনেক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সব স্টেশন আধুনিক ও অভিন্ন সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনতে কিছুদিন সময় লাগবে। সূত্র:বণিক বার্তা, মার্চ ২১, ২০২১


ট্রেন বেড়েছে, আধুনিকায়ন হয়নি সিগন্যাল ব্যবস্থা

শামীম রাহমান :গত ১০ বছরে ১৩১টি নতুন ট্রেন চালু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রুট সম্প্রসারণ করা হয়েছে আরো ৩৮টি ট্রেনের। বিদ্যমান রেলপথে এসব নতুন ট্রেন যুক্ত করলেও সে অনুপাতে সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নে মনোযোগ দেয়নি রেলওয়ে। ফলে সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতায় একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগ স্টেশনে দুই ট্রেনের মুখোমুুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় লাইনচ্যুত হয় রংপুর এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেন দুর্ঘটনায় সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রকল্প পরিচালক আতিকুর রহমান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এখনো অনেক স্টেশনে তারের কুণ্ডলী দিয়ে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটা তো ব্রিটিশ আমলের সিগন্যালিং পদ্ধতি। ব্রিটিশ আমলের পদ্ধতি এখন কেন ব্যবহার করা হবে? গত ১০ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রেলওয়ের এ বেহাল দশা আসলে খুবই কষ্টের। বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যানে বলা আছে, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে রেলপথে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল (সিটিসি) ও কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং (সিবিআই) সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশের সিংহভাগ রেলওয়ে স্টেশনকে এ ধরনের আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনার জন্য পৃথক ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয় মাস্টারপ্ল্যানে। তবে দেশের ৩৪২টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১০৮টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে এ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা। বর্তমানে পাঁচ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েতে। এর মধ্যে সর্বাধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থাটি হচ্ছে রিলে ইন্টারলকিং সিগন্যালিং। এ ব্যবস্থাটি পুরোপুরি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। সাধারণত যেসব স্টেশনে ট্রেন চলাচল বেশি, সেসব স্টেশনে এ সিগন্যাল ব্যবস্থা রাখা হয়। রেলওয়েতে এ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা সম্পন্ন স্টেশনের সংখ্যা ৩৩টি। এর ৩১টিই রয়েছে পূর্বাঞ্চলে। অন্যদিকে সিবিআইয়ের মতো আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার সংস্থান আছে ১০৮টি রেলওয়ে স্টেশনে। মাত্র ১২টি স্টেশনে ব্যবহার করা হচ্ছে সিটিসি সিগন্যাল ব্যবস্থা। বাকি ২১১টি রেলওয়ে স্টেশনে এখনো পুরনো পদ্ধতিতে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পুরনো পদ্ধতিগুলোর একটি হলো মেকানিক্যাল ইন্টারলকড সিগন্যাল ব্যবস্থা। এ রকম সিগন্যালের জন্য লাইনের পাশে এক ধরনের তার ব্যবহার করা হয়, যা সংযুক্ত থাকে স্টেশন এলাকায় স্থাপিত লিভারের সঙ্গে। এ লিভারে টান দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭২টি স্টেশনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। লাল-সবুজ বাতি ব্যবহার করে ট্রেনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয় দেশের ৯১টি রেল স্টেশনে। আবার ৪৮টি স্টেশনে সেই ব্যবস্থাও নেই। সেসব স্টেশনে ট্রেন প্রবেশের আগ মুহূর্তে স্টেশন মাস্টার ঠিক করেন, কোন লাইন দিয়ে ট্রেনটি যাবে। সে অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ট্রেন যাওয়ার লাইনটি ঠিক করে দেন। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিগন্যালিং ব্যবস্থা। এটিতে সামান্য ভুল হলেই ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশ রেলওয়েতে সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক।  তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নত বিশ্বে ট্রেনের সিগন্যাল ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তি এসে জটিল এ কাজটি সহজ করে দিয়েছে। পাশাপাশি এ আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সেসব দেশে ট্রেন পরিচালনাকেও সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি।  এখানে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই নামানো হয় একের পর এক ট্রেন। কিন্তু এ ট্রেনগুলো সুশৃঙ্খল ও ঝুঁকিমুক্তভাবে চলাচলের জন্য যে সিগন্যাল ব্যবস্থা দরকার, সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। এখানে উন্নয়নটা হচ্ছে বড় বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক। যেসব উন্নয়নে প্রচুর দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে, সেসব উন্নয়নকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করে একের পর এক ট্রেন নামাচ্ছি। যার খেসারত দিতে হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা উল্লাপাড়ার মতো দুর্ঘটনার মাধ্যমে। পাশাপাশি তিনি এসব দুর্ঘটনার জন্য রেলওয়েতে অদক্ষ জনবলের আধিক্যকেও দায়ী করেছেন। রেলওয়েতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এজন্য রেল খাতকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় ফেলে রাখাকে দায়ী করেন।  বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রেলের উন্নয়ন শুরু হয়েছে ১০ বছর ধরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমরা সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। তবে দীর্ঘদিন ধরে যে একটা বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি চাইলেই একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। রেলের উন্নয়নে মন্ত্রণালয় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে এ সময় জানান তিনি। সুত্র:বণিক বার্তা, নভেম্বর ১৬, ২০১৯


সিগন্যাল নিয়ে ৩ মাস আগেই অভিযোগ করেছিলেন চালকরা

সুজিত সাহা : মন্দবাদসহ একাধিক স্টেশনের সিগন্যাল ত্রুটি ও অস্পষ্টতার বিষয়ে তিন মাস আগেই অভিযোগ করেছিলেন ট্রেনচালকরা। চলমান ডাবল লাইন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রাখা নির্মাণসামগ্রী, বালি ও ইট রাখার কারণে দূর থেকে সিগন্যাল বাতি দেখা যেত না বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তারা। বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী সমিতি চলতি বছরের ৩০ জুলাই রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) কাছে সিগন্যাল, সংকেতসহ সেকশনওয়ারি নানা সমস্যা জানাতে বৈঠকের আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিংয়ের (সিআরবি) জিএম কার্যালয়ে সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জিএম নাসির উদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে সেকশন অনুযায়ী সিগন্যাল ত্রুটির কারণে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে লিখিত চিঠি দেয়া হয় সমিতির পক্ষ থেকে। জিএমের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হলেও মন্দবাগসহ সিগন্যালের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করেনি রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, মন্দবাগে প্রবেশের আগেই আউটারে বালির ঢিবির কারণে আপ আউটার সিগন্যাল দেখতে পান না চালক। এ কারণে মন্দবাগ স্টেশনের সিগন্যালের আগে আরো একটি রিপিটার সিগন্যাল বসানোর অনুরোধ করা হয়। অর্থাৎ মূল সিগন্যাল দেখা না গেলে বিকল্প সিগন্যালের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়। এখন পর্যন্ত সে দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। মন্দবাগ স্টেশন মাস্টার অফিস সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় পথিমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রাখে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করায় অনেক সময় এসব সামগ্রীর জন্য সিগন্যাল বুঝতে সমস্যা হয় চালকদের। বিশেষ করে রাতের বেলায় বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। তাছাড়া রাতে কুয়াশার কারণে প্রতিবন্ধকতা থাকলে সিগন্যাল দেখতেও সমস্যা হয় বলে জানিয়েছে চালক সমিতি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, মন্দবাগ স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটার সিগন্যাল দেখতে পান না চালক। সিগন্যালিংয়ের বিভিন্ন ত্রুটি ও এর প্রতিকার চেয়ে আমরা কয়েক মাস আগেই রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা না হলে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ট্রেন পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণই থেকে যাবে। সমিতির অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, বড়তাকিয়া, মুহুরীগঞ্জ স্টেশনের আপ আউটার গাছের জন্য দেখতে পান না চালক। এছাড়া হাসানপুর, গুণবতী স্টেশনের লুপ লাইন থেকে অ্যাডভান্স স্টার্টার সংকেত দেখা যায় না। সিলেট সেকশনের মনতলা, শাহাজীবাজার, কুলাউড়া, মাইজগাঁও স্টেশনের আউটার হোম সিগন্যাল রেলপথ সংলগ্ন গাছের ডালপালার কারণে দৃশ্যমান হয় না। এজন্য বেশকিছু সেকশনের স্টেশনে ট্রেন প্রবেশ নির্বিঘ্ন করতে একাধিক রিপিটার সিগন্যাল বসানোর প্রস্তাব করা হয় সমিতির পক্ষ থেকে। এর মধ্যে লাকসাম আপ আউটার থেকে হোম সিগন্যাল দেখা না যাওয়ায় রিপিটার সিগন্যাল বসানো জরুরি বলে জানান সমিতির নেতারা। এছাড়া ভৈরব আপ আউটার, আখাউড়া-গঙ্গাসাগর সেকশনের ডাউনের এটি বোর্ড থেকে আউটার এবং আউটার থেকে হোমের রিপিটার, শশীদলের ডাউন আউটার, ভানুগাছ স্টেশনের আপ আউটার ও রশিদপুর স্টেশনের ডাউন আউটারে রিপিটার সিগন্যাল বসানোর দাবি জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি সিজিপিওয়াই-ফৌজদারহাট সেকশনের এটি বোর্ড থেকে হোম সিগন্যাল দেখা না যাওয়ায় রিপিটার সিগন্যাল বসানোর প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি রেলের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে। জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর রেলের বিভিন্ন সংগঠন আমার সঙ্গে দেখা করেছে। তারা যেসব দাবি দিয়েছিল, সেগুলো নিশ্চিতভাবেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় পাঠানো হয়েছে। সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমাধান করবে। সুত্র:বণিক বার্তা, নভেম্বর ১৪, ২০১৯