জাহানুর রহমান খোকন:
সারা বিশ্বে যখন নিত্যনতুন সেবার মাধ্যমে যাত্রীদের আকৃষ্ট করে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করা হচ্ছে। আর আমাদের দেশে নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে সাধারণ মানুষ যখন রেল রেলযোগাযোগমুখী হচ্ছে সে সময় যাত্রী সেবার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ। প্রতি বছর বাজেট বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন রেললাইন হচ্ছে, কোচ আনা হচ্ছে অথচ গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় যাত্রীসেবা তাকেই উপেক্ষা করা হচ্ছে ।
আট ফুট বাই দশ ফুট একটি কক্ষের সাথে যুক্ত আড়াই ফুট বাই তিন ফুট একটি টয়লেট। ওই কক্ষটি সাধারণ যাত্রীদের বিশ্রামাগার। কক্ষটিতে সবসময় যাত্রী ঠাসা থাকে। সেই সঙ্গে টয়লেটের সামনে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। ওই সারিতে দাঁড়ানো শিশু থেকে বৃদ্ধ,এমনকি নারী যাত্রীরাও। একটানা অপেক্ষা তাদের। প্রকৃতিক ডাক- কেউ অপেক্ষা করতে পারছেন, কেউ পারছেন না। বেশ কয়েকটি শিশুকে দেখা গেল প্লাটফর্মের এক কোণে টয়লেট সারতে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ অন্যসব যাত্রীরা বকাঝকা শুরু করেছেন। কক্ষের ভিতরে লাইনের সামনে থাকা অপেক্ষমাণ যাত্রীরা দরজায় থেমে থেমে থাপ্পড় দিচ্ছেন। এমন বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে টয়লেট সেরে যিনি বের হলেন তিনি দু’চোখ লাল করে তাকাচ্ছেন।মুখে তিক্ত গালী- ‘শালার বেটার ঘর বিড়ি খাওয়ার আর যায়গা পায় না।’
কাউনিয়া জংশনের টয়লেট ঘিরে কক্ষটিতে রাত-দিন সারাক্ষণ চলে এই বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, চলে কথা কাটাকাটি। এমন পরিস্থিতির খবর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কানে কখনও পৌঁছেছে বলে মনে হয় না।তবে ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ যাত্রীরা বলছেন, ট্রেন যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা নেই- যা একটু আধটু আছে তাও ব্যবহারের অনুপযোগী। এতবড় স্টেশনে টয়লেটের যদি এমন হাল হয় তবে ‘রেল আধুনিক হচ্ছে’ কি করে?রেলপথমন্ত্রী যাত্রী সাধারণের রোজকার এ চলমান দুঃসহ-দুর্দশার কথা কি জানেন?
অথচ সাড়া দেশে যখন রেলওয়ের ভর্তুকি বানিজ্য চলছে তখন কাউনিয়া রেলওয়ে জংশন প্রতিবছর কোটি টাকার ওপরে রাজস্ব আয়ের যোগান দিচ্ছে। কিন্তু স্টেশনটিতে গণশৌচাগার নেই।বিশ্রামাগার অপরিচ্ছন্ন। এ ছাড়া লোকবল-সংকটসহ রয়েছে নানা সমস্যা।
রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, স্টেশনটি ১৯০৩ সালে স্থাপন করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই স্টেশন থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আয় হয়েছে। কিন্তু স্টেশনটিতে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অথচ রেলপথে রংপুর থেকে ঢাকা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর যেতে হলে কাউনিয়া রেলওয়ে জংশন অতিক্রম করতে হয়। প্রতিদিন এই স্টেশন দিয়ে শত শত যাত্রী যাওয়া-আসা করেন। এই রেলওয়ে জংশন হয়ে প্রতিদিন ২৮টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে আন্তনগর আটটি, মেইল দুইটি, লোকাল চারটি ও আটটি কমিউটার,চারটি শাটল ট্রেন রয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, স্টেশনটিতে প্রথম শ্রেণির একটি বিশ্রামাগার থাকলেও সেটি বন্ধ। এ বিষয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রথম শ্রেণির যাত্রী নেই। সেই সঙ্গে এটি তদারকির জন্য নেই কোনো আয়া।
প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের বসার জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। তবে খুঁটির সঙ্গে ছোট তিনটি গোল চক্কর রয়েছে। সেখানে কয়েকজন বসতে পারেন। দ্বিতীয় শ্রেণির একটি বিশ্রামাগার আছে। তা অপরিষ্কার।সেখানে বসেছে কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। কোনো গণশৌচাগার নেই।
যাত্রীদের অভিযোগ, গণশৌচাগার না থাকায় বিশেষ করে নারী যাত্রীদের বিড়ম্বনার শেষ নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী যাত্রী বলেন, প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে কী যে কষ্ট হয়। এই যুগে এসে এসব স্টেশনে শৌচাগার থাকবে না, তা কি কখনো হয়? স্টেশনের শহীদ মোফাজ্জল হোসেন পদচারী-সেতুটিরও বেহাল দশা।সেতুর নিচে পলেস্তারা খসে পড়ছে। রড বেরিয়ে গেছে।
কাউনিয়া স্টেশন মাস্টার বাবু আল রশিদ বলেন, এখানে ৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন স্বল্পতা। এর মধ্যে এসি ম্যান তিনজন,বুকিং সহকারি একজন,এএসএম একজন,পি.ম্যান দুইজন,ল্যাম্প ম্যান একজন ও কোটা একজন নেই। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শুধু আশ্বাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু অবকাঠামোর সংস্কারসহ কোনো উন্নয়নই আর হয় না ।
একজন রেলযাত্রী শুধু গ্রাহকই নন, বরং রেলওয়ের কাছে একজন যাত্রী বিজনেস পার্টনার, কেয়ার টেকার, গার্ডিয়ান এবং প্রটেক্টরের মতো। সর্বপরি একজন যাত্রী হল রেলওয়ের লক্ষী। আজ সেই লক্ষী উপেক্ষিত।