নীলফামারীর সোনারায় ইউনিয়নের দারোয়ানী রেলস্টেশনের অদূরে গোলক শাহপাড়া গ্রামের লেভেলক্রসিং। ২৬ জানুয়ারি সকালে ক্রসিংটি পারাপারের সময় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান পার্শ্ববর্তী ধনীপাড়া গ্রামের চার নারী। আহত হন আরো চারজন। সবাই উত্তরা ইপিজেডের শ্রমিক
এই ঘটনায় খুব মন খারাপ হয় আলমগীরের। মানুষের জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। ট্রেন আসার আগে দুই পাশে বাঁশ বেঁধে লেভেলক্রসিং বন্ধ করে রাখেন। ট্রেন পার হলে আবার তা তুলে দেন। বললেন, ‘চোখের সামনোত একে একে মেল্লা দুর্ঘটনা দেখিনু, ট্রেনোত কাটা পরি অনেক মানষি মরিল। সেই দিন (২৬ জানুয়ারি) চাইরটা মানষি একসাথে মরিল। মনটা খারাপ হইল। তারপর থাকি মনটা চাইল গেটোত পাহারা দিবার। নিজের বাঁশের আড়াবাড়ী (বাঁশঝাড়) থাকি দুই বাঁশ জোগাড় করি পরের দিন সকাল থাকি কামটা শুরু করিনু। ’
ট্রেন আসার আগেই আলমগীর হাজির
দিনে মোট ১২টি ট্রেন ওই লেভেলক্রসিং অতিক্রম করে ছুটে চলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ভোর ৫টার দিকে খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন চিলাহাটির উদ্দেশে। এ সময় থেকে লেভেলক্রসিং পারাপারে ভিড় জমে উত্তরা ইপিজেড শ্রমিকদের। সর্বশেষ রাত ৯টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে নীলসাগর এক্সপ্রেস অতিক্রম করে ওই লেভেলক্রসিং। আলমগীর বললেন, ‘ভোর ৫টা থাকি সকাল ৮টা পর্যন্ত বেশি ভিড় থাকে মানুষের পারাপার হওয়ার। এই সময়ে শ্রমিকরা কাজোত যায়। বিকেল চাইরটার পর থাকি সইন্ধা আটটা পর্যন্ত তাদের ফিরতি ভিড় থাকে রাস্তাত। হাতোত ঘড়ি নাই, কিন্তু সময় বুঝিবার পারো মুই। যেইঠে থাকোনা কেন সময়ের মধ্যেত মুই হাজির হও রেলগেটোত। ’ ট্রেন আসার বিষয়টি বুঝতে পারেন কিভাবে? ‘ট্রেন সিটি (হর্ন) মারে। ওইটা শুনিয়া মুই বাঁশ দিয়া গেট বন্ধ করো। ট্রেন যাওয়ার পর খুলি দেও। ’
একজন আলমগীর
দারোয়ানী গোলক শাহপাড়া গ্রামের মমতাজ উদ্দিনের ছেলে আলমগীর। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। স্কুলে যেতে পারেননি। নিজের জমিজমা বলতে নেই কিছু। একখণ্ড খাসজমিতে স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। সম্বল বলতে একটি রিকশা-ভ্যান আর সড়কের পাশে ছোট্ট একটি দোকান। সেই আয়ে কোনোভাবে দিন কাটে তাঁদের। দোকানটি পরিচালনা করেন তাঁর স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম। আলমগীর বলেন, ‘টিভির খবরোত প্রায় দিন শুনেছ ট্রেনোত মানষি কাটা গেইছে। অটো, বাস, ট্রাক, কারের সঙ্গে ট্রেন ধাক্কা লাগি মানষি মরিছে। এই মতন অ্যাকসিডেন্টোত মানষি মরেছে আর হামার প্রধানমন্ত্রীর দুর্নাম হোছে। যাতে এমন করি আর মানষি না মরে, হামার প্রধানমন্ত্রীরও দুর্নাম না হয় সেই জন্য পাহারার কাম শুরু করিনু। মোর মতন করি আরো মানষি আগে আসিলে এইস গেটোত মানষি মরতো কমি যাইবে। ’
স্বজনরা বললেন
আলমগীরের বাবা মমতাজ উদ্দিন ছেলের এমন কাজে বেজায় খুশি। তিনি বলেন, ‘হামেরা চাষাভুষা মানষি, অত কিছু বুঝি না। মোর বেটার কারণে মানষির জীবন রক্ষা পাছে। ’ আলমগীরের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম। বললেন, ‘মোর স্বামী ভালো কাজ করেছে। ’ তবে তিনি এটাও জানান, ওই কাজের জন্য আলমগীর রিকশা-ভ্যান নিয়ে এলাকার বাইরে যেতে পারছেন না। এতে করে কমেছে আয়-রোজগার। কিন্তু তার পরও তাঁরা খুশি।
এলাকাবাসী বললেন
দারোয়ানী বাজারের ব্যবসায়ী মহসিন আলী বলেন, ‘অরক্ষিত ওই রেলগেটটিতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষ মরেছে, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এর সমাধানের পথ আমরা বের করতে না পারলেও আলমগীর সেটি পেরেছেন। ’ সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম শাহ বলেন, ‘আলমগীর উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। ’ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের জন্য আলমগীর গেটের দুই পাশের সড়কে আরসিসি পিলারের জন্য আবেদন করেছিলেন। সেটি প্রক্রিয়াধীন আছে। ’
সূত্র: কালের কন্ঠ