বকুল আহমেদ : গত সোমবার রাত সোয়া ৮টায় মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেটে গিয়ে দেখা যায়, একজন বৃদ্ধ গেটের পাশে ঘণ্টিঘরে (রেলগেট সংলগ্ন গেটকিপারের ঘর) বসে আছেন। মাস্ক নেই মুখে। হাতে নেই গ্লাভস। মলিন চেহারা। কথা বলে জানা গেল, তিনি গেটকিপারের দায়িত্ব পালন করছেন। নাম শাজাহান আলী। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। ২০ বছর ধরে গেটকিপার হিসেবে চাকরি করছেন। স্থায়ী চাকরি তার। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শাহাজাহানপুরে বসবাস করেন। তিনি জানান, সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও সেটা তারা পাননি।
কারণ যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকলেও মালবাহী ট্রেন ও ইঞ্জিন যাতায়াত করে মাঝেমধ্যে। তখন গেট নামাতে হয়। করোনাভাইরাসের কারণে তিনি আতঙ্কে দিন পার করছেন। এই মুহূর্তে গেটের দায়িত্ব পালন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। গেট দিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের যাতায়াত। তাদের মধ্যে কে আক্রান্ত কে আক্রান্ত না, তা তো বোঝার উপায় থাকে না। করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে রেলওয়ে সংশ্নিষ্ট বিভাগ থেকে তাদের মাস্ক ও স্যানিটাইজ ব্যবস্থার কিছুই দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। বলেন, একদিকে আতঙ্ক, আরেক দিকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বাসা থেকে ওয়্যারলেস রেলগেটে যাতায়াতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রিকশা ভাড়া বেশি। যে কারণে হেঁটেই যাতায়াত করতে হয় দীর্ঘপথ।
সোমবার রাত পৌনে ৯টায় মালিবাগ রেলগেটে গিয়ে দেখা যায়, তিনজন রেলগেটের পূর্বপাশে ঘণ্টিঘরের সামনে বসে আছেন। তিনজনই গেটকিপার। তারা জানান, এই রেলগেটে তিন শিফটে ১২ জন গেটকিপার দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ছয়জনের চাকরি স্থায়ী এবং অপর ছয়জনের চাকরি অস্থায়ী। তারা দিন হাজিরায় কাজ করেন। গেটকিপারদের কোনো ছুটিছাঁটা নেই বলে জানালেন তারা। গেটকিপার এনায়েত হোসেন জানান, পাঁচ বছর ধরে তিনি কর্মরত। তার চাকরি অস্থায়ী। বলেন, ‘ইচ্ছা থাকলেও ছুটিতে নিতে পারব না। কারণ দিন হাজিরায় রেলগেটে কাজ করি। তবে বেতন মাসে পাই। কাজ না করলে হাজিরা হবে না। তাই ঝুঁকি থাকলেও কাজ করছি।’ তিনি জানান, চার মাস বেতন পাননি। চাকরির পাশাপাশি ইলেকট্রিকের কাজ করে কোনো রকমে চার সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে বেঁচে আছেন। আরেক গেটকিপার নিজাম উদ্দিন জানান, তার স্থায়ী চাকরি। ১১ বছর ধরে চাকরি করছেন। বলেন, করোনাভাইরাস রোধে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের মাস্ক ও স্যানিটাইজের কোনো ব্যবস্থা করেনি। কেউ কেউ নিজ খরচে এসব উপকরণ সংগ্রহ করেছেন।
খিলগাঁও রেলগেট থেকে মগবাজার রেলগেট পর্যন্ত দায়িত্বরত কিম্যান বাদশা মিয়া বলেন, ‘ঝুঁকির মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে আমাদের।’
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সারাদেশে বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল। তবে মালবাহী ট্রেন এবং খালি ইঞ্জিন মাঝেমধ্যে চলাচল করছে। যে কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির বাইরে থেকে গেছেন রেলগেটের গেটকিপাররা। তারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেলগেটে দায়িত্ব পালন করছেন ঝুঁকি নিয়ে। সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থায় নেই তাদের। এমনকি রেলওয়ের সংশ্নিষ্ট বিভাগ থেকেও এসব গেটকিপারকে সুরক্ষার উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বাসা থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতেও সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। ঢাকার বিভিন্ন রেলগেটের গেটকিপারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেলপথে রেলগেটের সংখ্যা দুই হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে টঙ্গী রেলস্টেশনের আগ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি গেট রয়েছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রয়েছে ১৩টি গেট। এসব গেটকিপারের একটি বড় অংশ অস্থায়ী ভিত্তিতে দিন হাজিরায় কাজ করেন। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও ছুটি নেই গেটকিপারদের। সুরক্ষা ছাড়াই প্রত্যেক রেলগেটে তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের।
সুত্র:সমকাল: ০৯ এপ্রিল ২০২০