শিরোনাম

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ঝুঁকি জেনেও চলছে ট্রেন


।। নিউজ ডেস্ক ।।
ঢাকা-ময়মনসিংহ জীর্ণ রেলপথে ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে চলছে ২৮ জোড়া ট্রেন। পুরো রেলপথে স্থানে স্থানে নেই ফিশ বোল্ট, স্লিপার, হ্যান্ডল ক্লিপ ও পাথর। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমে তা হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমে তা হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রেলকর্মী থেকে যাত্রী সবার মনেই ভয়– না জানি কখন দুর্ঘটনায় পড়ে ট্রেন! এদিকে ত্রিশালের ফাতেমানগর এলাকায় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। রবিবার রাতে এ রুটে ভোগান্তির শিকার হন যাত্রীরা। এ ধরনের বিপর্যয় ও ভোগান্তি থেকে রেহাই দিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথকে ডুয়েলগেজ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

গত রোববার রাতের ট্রেন দুর্ঘটনায় ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে চলাচল করা ২৮ জোড়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। এতে বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়া ট্রেনযাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। কেউ বিকল্প পথে ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা বা অন্য গন্তব্যে গেলেও অনেকে স্টেশনগুলোতে অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় পার করেন। গত রোববার রাতে জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের তিনটি বগি ফাতেমানগর স্টেশনের অদূরে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে রেললাইন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা মেরামত করে ১২ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু হয় গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে। এর আগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে রোববার রাত ১১টার দিকে ছেড়ে আসে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস। এ ট্রেনটি ময়মনসিংহ জংশনে ৬ ঘণ্টা এবং ময়মনসিংহ থেকে সকাল সোয়া ৯টায় ফাতেমানগর স্টেশনে পৌঁছলে সেখানেও দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় যাত্রীদের। গতকাল মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ভোর ৫টায় কমলাপুর পৌঁছার কথা থাকলেও বেলা সোয়া ২টায় পৌঁছায়। এতে ৬ ঘণ্টার যাত্রা ভোগান্তির ১৪ ঘণ্টায় পরিণত হয়। এভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে যাতায়াতকারী সব ট্রেনের যাত্রীদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়েছে।
গতকাল সকাল ৭টার দিকে ময়মনসিংহ স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস এবং জামালপুর থেকে আসা যমুনা এক্সপ্রেসের দুটি ট্রেন। ময়মনসিংহ জংশন থেকে রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। দুর্ঘটনায় ট্রেনটি আটকে পড়ায় যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে বসে কিংবা মাদুর পেতে শুয়ে সময় কাটান। মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন নিখিল পাল। তিনি বলেন, ট্রেনে প্রথম বারের মতো এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। পুরো রাত গেছে অনিদ্রা ও ভোগান্তি নিয়ে। ট্রেনটির যাত্রী শ্যামগঞ্জের আবদুল মালেক স্ত্রী ও দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর। সেখানে একটি এলপি গ্যাস কোম্পানিতে কাজ করেন। সকাল ৯টায় অফিস করার কথা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এমন ভোগান্তি আর হয় না। ঢাকা-ময়মনসিংহ লাইনটি ডুয়েলগেজ থাকলে একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লেও বাকি লাইনে গাড়ি চলতে পারত। এতে মানুষের ভোগান্তি কমে আসত।

ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আমিন কালাম বলেন, ময়মনসিংহ-ঢাকা ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের জন্য গত ৩৩ বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছি। বিপর্যয় ও মানুষের ভোগান্তি কমাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।

‘নাটবোল্ট’ না থাকায় দুর্ঘটনা ত্রিশালের ফাতেমানগর স্টেশনের কাছে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হয়। বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ কর্মকর্তা শাওন সৌমিক কবিরকে কমিটির প্রধান করা হয়। কমিটিকে ৫ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ঘটনার পর রোববার রাত থেকেই কাজ শুরু করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। গতকাল সকালে ফাতেমানগর স্টেশনের স্টেশনমাস্টারের কক্ষে বসে তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়া প্রস্তুত করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। রেললাইনটির ক্রসিং পয়েন্টের নাটবোল্ট সমস্যার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা। ক্রসিং পয়েন্টে নাটবোল্ট না থাকায় লাইনটি প্রসারিত হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বলে একমত হয়েছেন কমিটির তিনজন সদস্য। একই স্থানে বছরখানেক আগেও একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়েছিল এবং ট্রেনটি তাৎক্ষণিক উঠে যেতে পারলেও লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ফাতেমানগর স্টেশনের মাস্টার আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, লাইনটির অবস্থা খারাপ থাকার কারণে ১০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৫৮ কিলোমিটারজুড়ে ঝুঁকি ত্রিশালের ফাতেমানগর স্টেশন থেকে দু’দিকে অন্তত দেড় কিলোমিটার পথ ঘুরে দেখা গেছে, রেললাইনের ৭০টি সংযোগে ১১৮টি নাটবোল্ট নেই। ওই এলাকায় স্টিলের স্লিপারে ৮৩৭টি হ্যান্ডল ক্লিপ পাওয়া যায়নি। এছাড়া বেশ কয়েকটি স্টিলের স্লিপার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। রেললাইনটিতে নিজের গরু চরাচ্ছিলেন ফাতেমানগর স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান। সত্তরোর্ধ্ব সিদ্দিকুর বলেন, স্থানে স্থানে নাটবোল্ট নেই। এক জায়গা থেকে খুলে আরেক জায়গায় লাগানো হয়। এর কারণেই লাইনে দুর্ঘটনা। নাটবোল্টের এমন অবস্থা থাকলেও কারও কোনো পদক্ষেপ নেই। স্থানীয় আহাদ আলী বলেন, লাইনগুলো সঠিকভাবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এমন অবস্থা হয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ সদরের উমেদনগর স্টেশন পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার রেলপথটি ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী গফরগাঁও সার্কেল দেখভাল করেন। পুরো এলাকার স্থানে স্থানে নেই কাঠ ও স্টিলের স্লিপার, হ্যান্ডল ক্লিপ, ডগ স্পাইক, ফিস বোল্ট ও পাথর। দুই বছর ধরে এলাকাটি বেশি দুরবস্থার মধ্যে আছে। রেলপথের বিভিন্ন সংস্কারে গত ৫ বছর ধরে কাজ করছেন একজন কর্মী। সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে ফাতেমানগর স্টেশনে কথা হয় ওই কর্মীর সঙ্গে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে বেশ খারাপ অবস্থা লাইনটির। যে জায়গায় চারটি নাটবোল্ট থাকার কথা সেখানে আছে মাত্র দুটি, তাতেও প্যাঁচ নেই। সকালে নাট লাগিয়ে এলে বিকেলে খুলে যায়। ওই অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে কোনো মতে লাইন টিকে আছে। তিনি আরও বলেন, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানে অন্তত দেড়শ নাটবোল্ট না থাকার কথা। ২০ দিন আগেও কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। তাঁকে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল তার দিয়ে বেঁধে রাখতে। তা করলেও তার থাকে না। নাটবোল্ট না থাকায় যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা রয়েছে।

কর্মকর্তারা যা জানালেন ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (গফরগাঁও সার্কেল) নাজমুল হোসেন বলেন, ১৯৭৭ সালে নির্মিত লাইনটির পুরো অংশই জীর্ণ হয়ে অকেজো হয়ে গেছে, এখন আর মেয়াদ নেই। মেরামত করলেও শতভাগ হচ্ছে না। অধিকাংশ স্লিপার ভাঙা, নাটবোল্ট কম, যেগুলো খোলা হয় সেগুলো পুনরায় স্থাপন করা যায় না, নাটের প্যাঁচ থাকে না, পাথরও নেই। নানা সংকটের কথা জানিয়ে গত ১৪ মাসে ৩ বার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে। তিনি বলেন, ৫৮ কিলোমিটার এলাকায় ৫ হাজার স্লিপার প্রয়োজন, ১ লাখ ১৬ হাজার হ্যান্ডল ক্লিপ ও ২৫ শতাংশ এলাকায় ডগ স্পাইক নেই। গত জুনে চাহিদা থেকে মাত্র ৩০০ নাটবোল্ট পাওয়া গেছে, তাও লাগানো শেষ।

ময়মনসিংহ রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আকরাম আলী বলেন, রেললাইনটি অনেক পুরোনো। দুর্ঘটনার পর ট্রেনটি প্রায় ৩০০ ফুট টেনে নিয়ে যাওয়ায় লাইনের অনেক ক্ষতি হওয়ায় মেরামতে সময় বেশি লেগেছে। ফিসবোল্ট, স্লিপারসহ অন্যান্য জিনিসের চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটির প্রধান শাওন সৌমিক কবির বলেন, তদন্তের কাজ আরও বাকি রয়েছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বলা যাবে।

সূত্রঃ সমকাল


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Comments are closed.